নিজেস্ব প্রতিবেদকঃ
সরকারি চাকরি কেবল জীবিকা নির্বাহের একটি পেশা নয়; এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য সুযোগ—এমন মন্তব্য করেছেন রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা ফারজানা।
তিনি বলেন, “একজন সরকারি কর্মকর্তা শুধু একটি পদে দায়িত্ব পালন করেন না; তিনি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মানুষের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন। তাই সততা, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও মানবিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করাই একজন কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।”
বাংলাদেশের সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত প্রত্যেক ব্যক্তির দায়িত্ব হিসেবে জনগণের সেবা করার কথা বলা হয়েছে উল্লেখ করে ইউএনও বলেন, এই সাংবিধানিক নির্দেশনা শুধু একটি নীতিবাক্য নয়; এটি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি।
বরিশালের কৃতিসন্তান উম্মে হাবিবা ফারজানা বিসিএসের ৩৭তম ব্যাচে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে কর্মজীবন শুরু করেন মাদারীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে। পরবর্তীতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে গত ১৬ জুলাই রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় যোগ দেন তিনি।
যোগদানের পর অল্প সময়ের মধ্যেই দুর্গাপুরের সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর কাজের ধরন ও আন্তরিকতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে তিনি নাগরিক সেবাকে কেবল দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের বাস্তব প্রয়োজন, অসহায়ত্ব ও প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে আসা একজন মানুষ যেন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, দীর্ঘসূত্রতা কিংবা অপ্রয়োজনীয় হয়রানির কারণে ফিরে না যান—এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারি সহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছানো, দুর্যোগ ও সংকটে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তাঁর কাছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব শুধু ফাইল নিষ্পত্তি বা সভা পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাঠ প্রশাসনের এই পদটি মূলত রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। আইন প্রয়োগ, জনসেবা, উন্নয়ন কার্যক্রমের সমন্বয়, দুর্যোগ মোকাবিলা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তদারকি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে সমন্বয় সাধনের পাশাপাশি মানুষের দুঃসময়ে প্রশাসনের মানবিক মুখ হয়ে ওঠাও এই দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরই একটি প্রতিফলন দেখা যায় দুর্গাপুরের সেবা নিতে আসা মানুষের কথায়।
জয়নগর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামের ৬০ বছর বয়সী ফতেজান বেওয়া বলেন, “মানুষের মুখে শুনিছি ইউএনও ভালো মানুষ, তাই সাহায্যের জন্য আসিছিনু। আমার মাজার হাড় ভাঙা শুনে আমাক এক বস্তা খাওয়ার দিল, টাকাও দিল। আল্লাহ তার ভালো করুক।” তিনি সরকারি কোনো সুবিধা পান কি না জানতে চাইলে ফতেজান বেওয়া বলেন, “বয়স্ক ভাতা না বিধবা ভাতা—কি একটা জানি পাই।”
আরেক সেবাগ্রহীতা দুর্গাপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের শানপুকুরিয়া গ্রামের সেলিম জানান, তাঁর মেয়ের মাটির ঘরটি ভেঙে পড়ার পর সহায়তার জন্য উপজেলা প্রশাসনের কাছে আসেন তিনি। সেলিম বলেন, “২ বান্ডিল টিন ও ৬ হাজার টাকার চেক এবং এক বস্তা শুকনা খাবার দিয়েছেন। ভাবতেই পারিনি কোনো হয়রানি ছাড়াই এই সাহায্য পাবো।”
এ ধরনের উদ্যোগকে তিনি কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ হিসেবে দেখেন না—বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে দেখেন।
উম্মে হাবিবা ফারজানা বলেন, “জনগণের সেবা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তাই নাগরিক সেবা সহজ, সুলভ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে সরকারি কর্মচারীদের আরও জনবান্ধব ও আন্তরিক হতে হবে। মানুষ যেন তার প্রাপ্য সেবা নিতে এসে মনে না করেন যে তিনি কারও কাছে অনুগ্রহ চাইতে এসেছেন—বরং তিনি তাঁর অধিকার চাইতে এসেছেন।” তিনি আরও বলেন, “সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনগণের চাকর বা দাস নন; তাঁরা প্রজাতন্ত্রের সেবক। ক্ষমতা মানুষের ওপর প্রয়োগ করার জন্য নয়, মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য। একজন কর্মকর্তা কত বড় পদে আছেন—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাঁর কাছে এসে একজন সাধারণ মানুষ কতটা স্বস্তি নিয়ে ফিরে যেতে পারলেন।”
দুর্গাপুরে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গিই যেন প্রশাসনিক কাজকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। মাত্র ৩৫ কার্যদিবসের কর্মপরিধিতে মানুষের আস্থা অর্জনের এই প্রচেষ্টা হয়তো তাঁর দায়িত্বের একটি ছোট অধ্যায়। কিন্তু একজন নাগরিকের চোখের পানি মুছে দেওয়া, একজন অসহায় মানুষের ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়া কিংবা সরকারি সেবা পেতে আসা মানুষকে হয়রানিমুক্তভাবে ফিরিয়ে দেওয়া—এসব ছোট ছোট ঘটনাই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করে। আর সেই আস্থাই একজন সরকারি কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় অর্জন।

