নিজেস্ব প্রতিবেদকঃ
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার পানানগর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মহিপাড়া গ্রামের যুবলীগ নেতা জিয়াউর রহমান জুয়েলকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
নিয়োগের নামে অর্থ নেওয়া, আর্থিক অনিয়ম, জোর পূর্বক মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়া, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জোর করে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া এবং ব্যাংক ঋণ ও এফডিআর-সংক্রান্ত বিরোধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব বিষয়ে ভুক্তভোগীদের মামলা, সাধারণ ডায়েরি ও থানায় লিখিত অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট নথির তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর একজন বাসিন্দা এবং জুয়েলের পরিবারের সদস্যের পক্ষ থেকেও তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয় ও স্থানীয় প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসীর অনেকে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, জুয়েল ২০১২ সালে পানানগর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি হন এবং ২০১৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরে ইউনিয়ন যুবলীগের সহ-সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান। ২০১৮ সালে তিনি মহিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি পদ বাগিয়ে নেন দলীয় প্রভাব খাটিয়ে।
জুয়েলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি মহিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের নিয়োগকে ঘিরে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৩ সালে অফিস সহকারী, আয়া, নৈশপ্রহরী ও মালি পদে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন প্রার্থীর কাছ থেকে প্রায় অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের প্রতিবাদ করায় একজন শিক্ষক প্রতিনিধিকে মারধরের অভিযোগও রয়েছে। পরে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি বন্ধ হয়ে যায় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
তবে অর্থ দেওয়ার দাবি করা কয়েকজন চাকরিপ্রত্যাশী প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে ভয় পাচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাসিন্দা সিলবার অভিযোগ, ২০২২ সালে জমির বায়না বাবদ তিনি জুয়েলের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেন। পরবর্তীতে জমি রেজিস্ট্রি না হওয়াকে কেন্দ্র করে আর্থিক বিরোধ তৈরি হয়।
সিলবার দাবি, গত ২৯ জুন সকালে জুয়েলের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তার নামে নিবন্ধিত রাজশাহী-ল ১৬-২২৯২ নম্বরের মোটরসাইকেলটি জোর করে ছিনিয়ে নেয়। একই সময় তাকে মারধর করে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরে ২২ জুলাই দুর্গাপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন সিলবা।
জুয়েলের বড় ভাই কামরুজ্জামান সোহেলের স্ত্রী শিমু ইয়াসমিন লিপিও তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন। লিপির অভিযোগ, ভুল তথ্য ও প্রলোভনের মাধ্যমে তার এফডিআরের বিপরীতে আইএফআইসি ব্যাংকের বানেশ্বর শাখা থেকে ঋণ নেওয়া হয়। ঋণের অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় তিনি এফডিআরের টাকা ফেরত পাননি বলে দাবি করেন।
এ ঘটনায় দুর্গাপুর আদালতে ৪০৮সি/২০২৬ নম্বর মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০/৩৪ ধারার কথা উল্লেখ করেছেন লিপি। মামলার পর তাকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও করেছেন তিনি।
লিপির আরও দাবি, গত ২০ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজিরা শেষে বের হওয়ার সময় জুয়েল, তার স্ত্রী লাবনীসহ কয়েকজন তার ওপর হামলা করেন। এ ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগে ১০৭ ধারায় ৬৮৯পি/২০২৬ নম্বর মামলা করেছেন বলে জানান তিনি। এর আগে হয়রানির অভিযোগে রাজপাড়া থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেছিলেন বলে তার দাবি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও জুয়েলের স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি কমেনি। ২০২৬ সালে পানানগর বাজার এলাকায় গোপন বৈঠকের মাধ্যমে তাকে ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি করার দাবি করেছেন কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি। রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও লোকজন নিয়ে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে পৃথক ঘটনায় একাধিক অভিযোগ, জিডি ও মামলা থাকলে প্রতিটি বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয় বা স্থানীয় প্রভাব বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে জিয়াউর রহমান জুয়েলের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
দুর্গাপুর থানার তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, থানায় এ ধরনের অভিযোগ হয়ে থাকলে নথি দেখে বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে। প্রয়োজন হলে ডিউটি অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা—অভিযোগগুলো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের বাইরে রেখে তদন্ত করা হোক এবং তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

