নিজেস্ব প্রতিবেদকঃ
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর তৃণমূল (উপজেলা ও পৌরসভা) কমিটি দীর্ঘদিন আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে পরিচালনা এবং নির্বাচন পরবর্তী কর্মী মূল্যায়নের অভাবজনিত প্রভাব পড়েছে।
বিএনপি- এর তৃণমূল কাঠামো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের সিংহভাগ উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে দল এবং এর প্রধান প্রধান অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন (যেমন: ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল, শ্রমিক দল ইত্যাদি) পূর্ণাঙ্গ নির্বাচিত কমিটির পরিবর্তে বছরের পর বছর ‘আহ্বায়ক কমিটি’ দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এতে স্থানীয় নেতা কর্মীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি বা সম্মেলন করার শর্তে গঠন করা এসব আহ্বায়ক কমিটি বাস্তবে বছরের পর বছর একই অবস্থায় টিকে থাকছে।
এর ফলশ্রুতিতে, জাতীয় নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে তৃণমূল কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া এবং সাংগঠনিক চর্চার অভাবে দলটির তৃণমূল পর্যায় মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতির প্রধান সংকট- আহ্বায়ক কমিটির স্থায়ী রূপ লাভ ও নেতৃত্বের অপচর্চা। কতিপয় নেতার একচ্ছত্র প্রভাব দলে। আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব বা প্রভাবশালী ২/৩ জন নেতা পুরো উপজেলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখছেন। দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতার একক চর্চার ফলে এক ধরনের ‘ভাই /বন্ধু সর্বস্ব’ রাজনীতি চালু হয়েছে, যেখানে গঠনতান্ত্রিক নিয়মের চেয়ে ব্যক্তি নির্ভরতা মুখ্য হয়ে উঠেছে।
সম্মেলন বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কমিটি না হওয়ায় আহ্বায়ক কমিটির শীর্ষ ব্যক্তিরা ইচ্ছা অনুযায়ী দলের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিজেদের বলয় ভারী করার কাজে পদ-পদবি ব্যবহার করছেন।
ত্যাগী ও সক্রিয় কর্মীদের মূল্যায়নহীনতা ও নিষ্ক্রিয়তা, যোগ্যতার মূল্যায়নে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে জেল-জুলুম সহ্য করা এবং মাঠে ভূমিকা রাখা ত্যাগী কর্মীরা যখন দেখেন বছরের পর বছর আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে দল চলছে এবং নতুন নেতৃত্বের সুযোগ বন্ধ, তখন তারা চরম হতাশায় ভুগছেন। অভিমান নিয়ে শহীদ জিয়ার অনেক আদর্শ সৈনিক নির্বাচনে বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মাঠপর্যায়ে প্রাণপণ খাটার পর কোনো স্বীকৃতি বা সাংগঠনিক পদে জায়গা না পাওয়ায় কর্মীদের বড় একটি অংশ রাজনীতি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে।
ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায় থেকে তৃণমূলের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতা নির্বাচনের যে চর্চা বিএনপির ঐতিহ্য ছিল, তা আহ্বায়ক কালচারের কারণে ব্যাহত হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় আহ্বায়ক কমিটির বিরোধিতা করে বঞ্চিতরা পাল্টা বলয় তৈরি করছে। ফলে দল গোছানোর চেয়ে নিজেদের ভেতরের বিরোধ নিরসনেই বেশি শক্তি অপচয় হচ্ছে। হাইব্রিড নেতাদের দাপটে দিনে দিনে ত্যাগী নেতারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে।
ছাত্রদল বা যুবদলের মতো মূল চালিকাশক্তি সংগঠন গুলোতে যদি থানা বা পৌর পর্যায় নিয়মিত নতুন কমিটি না হয়, তবে নতুন প্রজন্ম ও উদীয়মান নেতৃত্ব বিকশিত হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে বলে মনে করেছেন রাজনৈতিক চিন্তাবিদগণ। ভোটারদের সাথে বিএনপির মূল জনসংযোগ তৈরি করেন তৃণমূল কর্মীরা। কর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে আগামী যেকোনো জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন দলের নীতিনির্ধারকরা।
একটি জাতীয় পর্যায়ের বড় রাজনৈতিক দল যদি নিজেদের তৃণমূল পর্যায় সামলাতে ও গণতান্ত্রিক উপায়ে কমিটি দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে দলের পেশাদারিত্ব ও সুশাসনের বার্তা দুর্বল হয়ে পড়ে বলে জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁরা মনে করেন, আহ্বায়ক কমিটিগুলোর মূল কাজ হতে হবে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে কাউন্সিল/সম্মেলন আয়োজন করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা। নির্ধারিত মেয়াদের পর আহ্বায়ক কমিটির কার্যকারিতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করার কঠোর নিয়ম চালু রাখা। যারা বিগত সময়ে দলের দুর্দিনে মাঠে ছিলেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, তাদের তালিকা তৈরি করে নতুন কমিটিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদায়ন করার সুযোগ করে দেওয়া।
রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা আরও বলেন, কেন্দ্র বা জেলা পর্যায়ের নেতাদের পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে ‘পকেট কমিটি’ দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করে তৃণমূলের মতামত ও ভোটাভুটির ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচিত করা। যে সকল আহ্বায়ক কমিটির শীর্ষ নেতারা দীর্ঘ দিন ধরে সম্মেলন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন বা যাদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠছে, কেন্দ্র থেকে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।
তৃণমূলই যেকোনো রাজনৈতিক দলের প্রাণশক্তি। বিএনপি যদি দেশের রাজনীতিতে তাদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে চায় এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চায়, তবে অতি দ্রুত তৃণমূলের ‘আহ্বায়ক কালচার’ থেকে বেরিয়ে এসে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ত্যাগী ও রাজপথের কর্মীদের মূল্যায়ন করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা জরুরি বলে অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতামত ।

