স্টাফ রিপোর্টারঃ
পুরোনো বছরের গ্লানি, জীর্ণতা আর শোককে পেছনে ফেলে নতুন আশা ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে শুরু হলো বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-এর পথচলা। ভোরের সোনালি আলোয় রাজশাহীর দুর্গাপুর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে নব আনন্দের আবহ, প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখকে ঘিরে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে দুর্গাপুর জনপদ।
পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন এবং বাংলাদেশে এটি নববর্ষ হিসেবে সর্বজনীন লোক উৎসবের রূপে পালিত হয়। অতীতের গ্লানি ভুলে নতুন বছরকে আনন্দ, কল্যাণ ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় বরণ করা হয়। ১৫৫৬ সালে সিংহাসনে আরোহনের পর মুঘল সম্রাট আকবরের সময়ে ফসলি সন প্রবর্তনের মাধ্যমে, যা পরে বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। একসময় কৃষিনির্ভর সমাজে খাজনা পরিশোধ, হালখাতা ও মেলার মধ্য দিয়ে নববর্ষ উদযাপিত হতো। বর্তমানে তা গ্রাম ও শহরজীবনে সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। বৈশাখী মেলা, লোকগান, নৃত্য, নাটক, খেলাধুলা ও ঐতিহ্যবাহী খাবার এই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ।
আধুনিক ও ডিজিটাল বাংলাদেশের ছোঁয়ায় হালখাতার পুরোনো ঐতিহ্য কিছুটা ম্লান হলেও বাঙালির আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এই উৎসব নতুন মাত্রায় উদযাপিত হচ্ছে। ঋতুচক্রের আবর্তনে আগত এই দিনটি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে এক মিলন মেলায় আবদ্ধ করেছে, যা বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাজশাহী-৫ (দুর্গাপুর-পুঠিয়া) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল ও দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাশতুরা আমিনা পৃথক বাণীতে উপজেলা বাসীকে শুভেচ্ছা জানান। সংসদ সদস্য তার বাণীতে বাংলা নববর্ষকে বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি আমাদের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও সু-দৃঢ় করে। অপরদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাশতুরা আমিনা নববর্ষকে ইতিহাস ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য প্রতীক আখ্যায়িত করে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে এ উৎসবের নিবিড় সম্পর্ক তুলে ধরেন এবং প্রযুক্তির এই যুগেও লোকজ সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ ধরে রাখার আহ্বান জানান।
দুর্গাপুর উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৮টা থেকে শুরু হয় দিনব্যাপী কর্মসূচি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী-৫ (দুর্গাপুর-পুঠিয়া) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল এবং অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাশতুরা আমিনা।
কর্মসূচির মধ্যে ছিল জাতীয় সংগীত ও ‘এসো হে বৈশাখ’ পরিবেশনা, বৈশাখী শোভাযাত্রা, মেলা উদ্বোধন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গ্রামীণ খেলাধুলা এবং রচনা প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা। ‘শান্তি, সৃজন, গৌরব ও গতিময়তা’র প্রতীকী বার্তা নিয়ে রঙিন প্রতিকৃতি, মুখোশ ও বাদ্যযন্ত্রের তালে মুখরিত এই শোভাযাত্রা অশুভ শক্তির বিনাশ ও কল্যাণময় আগামীর প্রত্যাশা ব্যক্ত করে।
এছাড়া উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা ‘শান্তি, মানবতা ও সম্প্রীতি’র প্রতিপাদ্যে সম্মিলিত সংগীত পরিবেশন করে নতুন বছরকে বরণ করে নেন। দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক আয়োজনে গান, কবিতা ও নৃত্যের পরিবেশনায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পায় পুরো এলাকা।
শুধু উপজেলা শহরেই নয়, গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচেও বইছে বৈশাখী উৎসবের হাওয়া। বিভিন্ন স্থানে বসেছে বৈশাখী মেলা, আয়োজন করা হয়েছে বলিখেলা, লাঠিখেলা ও হা-ডু-ডুর মতো ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খেলাধুলা, যা গ্রামীণ সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছে।
এদিকে উৎসবকে ঘিরে উপজেলা চত্বরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, যাতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সকলেই উৎসব উপভোগ করতে পারে।

