নিজেস্ব প্রতিবেদকঃ
রাজশাহী দুর্গাপুরে ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত উপজেলা বাসীর প্রাণের প্রতিষ্ঠান “স্বপ্নের বিদ্যাপীঠ” হিসেবে পরিচিত দুর্গাপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। যা পরবর্তীতে ২০১৮ সালে সরকারি করনের মাধ্যমে নামকরণ হয় দুর্গাপুর সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় প্রাণের এই প্রতিষ্ঠান আজ ধ্বংসের কবলে। নানা অনিয়ম,দুর্নীতি এবং স্বেচ্ছাচারিতার কারণে।
মোঃ শফিকুল ইসলাম সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পান ১৯৯৭ সালে । পরবর্তীতে ২০১১ সালে আ'লীগ সরকারের নৌকার বৈঠা ধরে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদটি নিজের দখলে নেন।শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অ্যাডহক নিয়োগ পান ২০১৮ সালে। সময় গড়াতেই নৌকার পালের হাওয়ায় পুনরায় সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদটি বাগিয়ে নেন ২০২৪ সালে। ক্ষমতা পেয়ে বোনে যান অনিয়ম ও দুর্নীতির বাদশা। প্রতিষ্ঠান থেকে হাতিয়ে নেন প্রায় অর্ধ কোটি টাকা। এমনটাই অভিযোগ উঠেছে শফিকুলের বিরুদ্ধে।
তার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে শিক্ষা কার্যক্রমে নেমে এসেছে স্থবিরতা। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যন্ত ব্যাহত হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। আর এই সংকটের পেছনে উঠে এসেছে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং প্রশাসনিক নীরবতার।
সূত্র বলছে, বিদ্যালয়টির সহকারী প্রধান শিক্ষক শফিকুলের বিরুদ্ধে ৪৬ লক্ষ টাকার আর্থিক অনিয়ম, সরকারি নির্দেশনা অমান্য এবং বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছিলেন তৎকালীন উপজেলা প্রশাসন। এরপরও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষভে ফুঁসে উঠেছে শিক্ষক, অভিভাবক ও সুশীল সমাজ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা শারমিন গত ১৩.০৮.২৫ ইং স্মারক নং-০৫.৪৩.৮১৩১.০০০.০২.০১৫.২৫-৭৪৭ মূলে সহকারী প্রধান শিক্ষক শফিকুলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি স্মারকলিপি প্রেরণ করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বিদ্যালয়ের জুলাই ২৪-মে ২৫ পর্যন্ত আর্থিক অডিট পরিচালনার জন্য গত ২২.০৬.২৫ ইং ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি অডিট টিম গঠন করা হয়।
অডিট প্রতিবেদনে উঠে আসে চোখ কপালে উঠার মত চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১২.০৯.১৮ ইং এর-৩৭.০০.০০০০.০৭১.১৫.০০৩.১৮.১১৬৭ নং পরিপত্র অনুযায়ী আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে যৌথ স্বাক্ষরের বিধান থাকলেও,শফিকুল একক স্বাক্ষরে বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করে প্রায় ২২ লক্ষ ৯৫ হাজার ৮১৫ টাকা উত্তোলন করেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উত্তোলিত অর্থের মধ্যে মাত্র ১০ লক্ষ ৩৫ হাজার ৯৪৩ টাকার ভাউচার পাওয়া গেলেও বাকি ১২ লক্ষ ৫৯ হাজার ৮৭২ টাকার কোনো ভাউচার বা হিসাব পাওয়া যায়নি। এছাড়াও মামলা পরিচালনার নামে ১ লক্ষ টাকা উত্তোলন, সরকারি কেনাকাটায় আয়কর ও ভ্যাট কর্তন না করা, ভাউচারে রাজস্ব টিকিট ব্যবহার না করা এবং দোকানঘরের ভাড়া বাবদ আয়-ব্যয়ের হিসাব অডিট টিমের নিকট উপস্থাপন না করার অভিযোগও উঠে আসে।
এদিকে এটি প্রথম নয়। এর আগেও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, দুর্গাপুর কর্তৃক ১১.১০.২১ ইং এর ৩৭.১০.৮১৩১.০০০.০০.০১৯.২১.১৮৩ নং স্মারকের অডিট প্রতিবেদনে শফিকুলের বিরুদ্ধে ২৩ লক্ষ ৩১ হাজার ২১৩ টাকা বিধি বহির্ভূত ভাবে ব্যয়ের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। পরবর্তীতে ৬ এপ্রিল ২২ ইং স্মারক নং-০৫.৪৩.৮১৩১.০০.১২.০২২.২১-১৩৯ মূলে ওই অর্থ বিদ্যালয়ের ফান্ডে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ জমা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
আদালতের জটিলতায় থমকে যাওয়া প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়টি ১৩.০৯.১৮ ইং জাতীয়করণ করা হয়। ৭.০৫.২৪ ইং সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ ১৩ জন শিক্ষক ও ৪ জন কর্মচারী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অ্যাডহক নিয়োগে যোগদান করেন। তবে প্রধান শিক্ষক পদে মোঃ শাহেদ আলী অ্যাডহক নিয়োগ না পাওয়ায় মাউশি অধিদপ্তরের ১৪.০৮.২৪ ইং এর স্মারক নং-৩৭.০২.০০০০.১০৬.৩৪.০০২.২২.৩৬৯৭ মূলে সহকারী প্রধান শিক্ষক শফিকুলকে আর্থিক ক্ষমতাসহ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ১৩.০৫.২৫ ইং শাহেদ আলী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অ্যাডহক নিয়োগে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং শফিকুলের নিকট থেকে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিন্তু তার নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনে ৮৩৪৩/২০২৫ নং রিট মামলা দায়ের হয়। আদালত গত ০২.০৬.২৫ ইং শাহেদের নিয়োগ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে রুল জারি করেন।
পরবর্তীতে শাহেদ সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালতে ২৩৯৮/২০২৫ নং লিভ টু আপিল পিটিশন দায়ের করলেও ০১.০৭.২৫ ইং আদালত “নো অর্ডার” প্রদান করে হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন। ফলে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত শাহেদ প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।
অন্যদিকে,আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পরেও শফিকুলকে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে শিক্ষা প্রশাসনকে। প্রশ্নের মুখে শিক্ষা প্রশাসন-একাধিক অডিটে আর্থিক অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ার পরও কেন এখনো অভিযুক্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক শফিকুলের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি ? এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে উপজেলা জুড়ে। পরবর্তীতে আমরাই দেশবাসীর সামনে তুলে ধরবো কে বা কারা কোন স্বার্থে শফিকুলকে স্বপদে বহাল রেখেছে এমন নানা তথ্য।
স্থানীয় সুশীল সমাজ, অভিভাবক ও সাবেক শিক্ষার্থীরা বলছেন,দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া রহস্যজনক।একটি সরকারি বিদ্যালয়ে বছরের পর বছর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তর কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ লক্ষ টাকা অনিয়মের অভিযোগ, অডিট প্রতিবেদনে অসঙ্গতি প্রমাণ এবং উপজেলা প্রশাসনের সুপারিশ থাকার পরও যদি কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের “জিরো টলারেন্স” নীতি বাস্তবায়িত হবে না।
এই বিষয়ে মুঠোফোনে কথা হয় অভিযুক্ত শফিকুলের সাথে। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ মিথ্যা। এই অভিযোগের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেছি রিট নং ১৬৩২৬ যা বিচারাধীন।
মুঠোফোনে কথা হয় তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা শারমিনের সাথে। তিনি বলেন,"অডিট প্রতিবেদনে যেসব অনিয়ম উঠে এসেছে, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হয়েছে।
কথা হয় দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাশতুরা আমিনার সাথে । তিনি বলেন, আমরা কেউ আইনের উর্ধ্বে নয়। এই বিষয়ে আমার জানা ছিল না। আমি আমার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে যত দ্রুত সম্ভব আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।
কথা হয় রাজশাহী-৫ সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোঃ নজরুল ইসলামের সাথে তিনি বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আপনাদের মাধ্যমে জানলাম। আমি এবং আমাদের সরকার সকল অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে আছি। তদন্ত সাপেক্ষে অবশ্যই আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। আইন সবার জন্য সমান।
স্থানীয় অভিভাবক, সাবেক শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।
মোবাইল নাম্বারঃ ০১৭১৭-৯৩৮৪৮৪
০১৯১৩-৭২৭৬৯০
ই-মেইলঃ alaminhaque86@gmail.com