নিজেস্ব প্রতিবেদকঃ
এ যেনো এক অপরাধের কালো রাজ্য। নেই কোন আইনের বালাই। আইনকে তোয়াক্কা করে, পুলিশের নাকের ডগায় সংঘটিত হচ্ছে সংঘ বদ্ধ অপরাধ, সক্রিয় হয়ে উঠেছে অপরাধী চক্র। হাতিয়ে নিয়েছে কোটি টাকা।
একজন শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর। যিনি ক্লাসে নীতি-নৈতিকতা শেখান। যার হাতে গড়ার কথা আগামীর ভবিষ্যৎ-সেই শিক্ষকই যখন প্রতারক-তখন সমাজের বিবেক থমকে দাঁড়ায়!
রাজশাহীর দুর্গাপুরে এমনই এক অভিনব প্রতারণার শিকার হয়েছেন নারায়ণপুর গ্রামের জান মোহাম্মদের ছেলে সুমনসহ অনেকেই।
পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখিয়ে তাদেরকে কম্বোডিয়ার আদম ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেওয়ার মত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সুখানদিঘি দাখিল মাদ্রাসা শিক্ষক আব্দুল মান্নানসহ ৩ ‘আদম দালালের’ বিরুদ্ধে।
এঘটনায় ভুক্তভোগীর পিতা জান মোহাম্মদ থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। চেয়েছেন আইনি সহায়তা।
অভিযোগ সুত্রে, উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামের আব্দুল মান্নান মাস্টার(৫০),মোঃ বাবুল(৪৮) ও কম্বোডিয়া প্রবাসী মোঃ শাকিব(২৮) এরা একটি শক্তিশালী মানবপাচার চক্র গড়ে তুলে। সুমনকে কম্বোডিয়ায় ভালো বেতনে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে পর্যায়ক্রমে দেশেই ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় এই চক্র। ১ বছরের ওয়ার্ক ভিসা দেওয়ার কথা থাকলেও সুমনকে দেওয়া হয়েছিল ৩ মাসের ট্যুরিস্ট ভিসা। গত ৮ অক্টোবর ২৫ ইং সুমন কম্বোডিয়ায় যাওয়ার পরই শাকিব তার পাসপোর্ট কেড়ে নেয়। এরপর সুমনকে একটি কোম্পানির কাছে ১ হাজার ডলারে (প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকায়) বিক্রি করে দেয়। সেখানে তার উপর চলতো অমানবিক নির্যাতন। বাধ্য করা হতো কঠোর পরিশ্রম করতে। পরবর্তীতে পুনরায় ভিসার নামে আরও ১ লক্ষ ৩২ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে এ চক্র।
নিরুপায় হয়ে জীবন বাঁচাতে সুমন পরিবারের সাথে যোগাযোগ শুরু করে। পরে সংশ্লিষ্ট চায়না কোম্পানিকে ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং ওভার-স্টে ও টিকেট বাবদ আরও ৫০ হাজার টাকা খরচ করে নিঃস্ব হয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরেন সুমন। অভিনব এই প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ৯ লক্ষ ৭২ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় মাষ্টার মাইন্ড মান্নানের প্রতারক চক্র। ঋণ দেনার দায়ে নিঃস্ব পরিবার এখন দিশেহারা।
সরেজমিনে- নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, ৩ দালালদের মধ্যে মান্নান ধর্ম ব্যবসায়ী। শিক্ষকতার লেবাস পরে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতেন। তার বিরুদ্ধে মসজিদের অর্থ আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। তিনি দেলুয়াবাড়ি ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি, থাকেন স্থানীয় একটি প্রভাবশালী ইউপি চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত)-এর ছত্রছায়ায়।
মান্নানের প্রধান সহযোগী বাবুল, কাপড় ব্যবসার আড়ালে ঘরে ঘরে গিয়ে, বিদেশের মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে লোক সংগ্রহ করতেন। এই কাজে তিনি মোটা অংকের কমিশন পেতেন বলে জানা যায়।
আরও জানা যায়, কম্বোডিয়ায় যাওয়ার পর সেখানে ‘রিসিভ’ করে প্রতারণা কোম্পানির কাছে বিক্রি করার মূল দায়িত্ব পালন করেন বাবুলের ভাতিজা এ চক্রের সেনাপতি শাকিব। এদের খপ্পরে শুধু জান মোহাম্মদের ছেলে সুমন একাই নয়, তাদের প্রতারণার ফাঁদে নিঃস্ব হয়ে বিভীষিকাময় দিন কাটছে উপজেলার বখতিয়ারপুর গ্রামের নুর ইসলামের ছেলে আমজাদ, নারায়ণপুর গ্রামের আব্দুল্লাহ'র ছেলে নাসির,আতাউরে ছেলে বিপ্লব, পাঁচুবাড়ি (চকপাড়া) গ্রামের সিদ্দিকুরের ছেলে সাগর ও ভবানিপুর গ্রামের মৃত খোকার ছেলে এনামুলের পরিবারে। এদের মধ্যে ৪ জনের পরিবার তাদের সন্তানদের ধারদেনা করে দেশে ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু এনামুল দেশে ফেরার টাকা না পেয়ে কম্বোডিয়ায় ফেরারি জীবন কাটাচ্ছে বলে জানায় তার পরিবার। বর্তমানে এলাকায় আতঙ্কের নাম মান্নান মাষ্টার। বাহিরের অনেকই আসে তার কাছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় তার সিন্ডিকেটের সদস্য থাকতে পারে এমটা দাবি স্থানীয়দের। তারা চান প্রতারক মান্নানকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।
ভুক্তভোগী সুমনের পিতা বলেন, মান্নান মাদ্রাসা শিক্ষকের ধর্মীয় লেবাস ও আশ্বাসে মুগ্ধ হয়ে জমি বন্ধক ও বিক্রি এবং ঋণ করে দফায় দফায় মান্নান মাস্টারের হাতে মোট ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা তুলে দিয়েছি। এখন টাকা ফেরত চাইলে আমাকে ও আমার ছেলেকে হুমকি দিচ্ছে। তারা প্রভাবশালী আদম দালাল হওয়ায় থানায় অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাচ্ছি না।
এই বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত মান্নানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন তুলেন নি।
এ বিষয়ে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পঞ্চনন্দ সরকার বলেন, আমি থানায় সদ্য যোগদান করেছি। অভিযোগের বিষয়ে আমার জানা নাই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মোবাইল নাম্বারঃ ০১৭১৭-৯৩৮৪৮৪
০১৯১৩-৭২৭৬৯০
ই-মেইলঃ alaminhaque86@gmail.com